ফার্মগেটে বাসে উঠবার সময় জলিল সাহেবের বাম পায়ের জুতার তলাটা খুলে গেল। বাসে উঠবার উত্তেজনায় ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করলেন না। শুধু মনে হল দাড়িয়ে তিনি যেন ঠিক আরাম পাচ্ছেন না। বাম পায়ে তেমন জোর নেই। | শাহবাগের কাছে এসে তিনি বসবার জায়গা পেলেন। অফিস টাইমে বসবার জায়গা। পাওয়া অসম্ভব ভাগ্যের ব্যাপার। নিশ্চয়ই কিছু একটা ঝামেলা আছে। তিনি আড়চোখে পাশে বসা লােকটির দিকে তাকালেন এবং শিউরে উঠলেন। লােকটির ঘাড় থেকে কান পর্যন্ত দগদগে ঘা। লালাভ একরকম রস সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ছে। জলিল সাহেবের পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠল। তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন তার পায়ের দিকে। আর তখনই দেখলেন বাম পায়ের জুতার তলাটার কোনাে চিহ্নই নেই। এক বছরও হয়নি। এর মধ্যে এই অবস্থা। পাশে বসা লােকটি বলল, ক’টা বাজে?

ন’টা।। লােকটা রাগী গলায় বলল, আপনার ঘড়িতে তাে ন’টা দশ বাজে। ন’টা বললেন কেন?

জলিল সাহেব তাকিয়ে দেখলেন লােকটির হাতেও ঘা। কুষ্ঠ নাকি? তিনি বা দিকে খানিকটা সরে এলেন। লােকটি পা মেলে যতটুকু জায়গা খালি ছিল সবটুকু ভরাট করে ফেলল।

আপনার জুতার কি হয়েছে? জলিল সাহেব জবাব দিলেন না। খুলে পড়ে গেছে নাকি?

বাসের অনেকগুলাে লােক উঁকি দিল। যেন দারুণ একটা মজার ব্যাপার। অনেক রকম ছােট ছােট প্রশ্ন হতে লাগল, কোন সময় খুলল ? টের পান নাই? বলেন কি?

কোন কোম্পানীর জুতা? বাটা নাকি? বাটা জুতার আগের কোয়ালিটি এখন আর নেই। | জুতার দোকানে না গিয়ে অর্ডার দিয়ে বানানােই এখন ভাল। হেসে-খেলে চার-পাচ বছর যায়। | জলিল সাহেব লক্ষ্য করলেন তার সামনের সিটে বসা দুটি মেয়ে ঘড়ি ঘুরিয়ে জুতা দেখতে চাচ্ছে। এই গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যেও তামাশা দেখা চাই। একটি মেয়ে আবার ফিক করে হেসে ফেলল। এর মধ্যে হাসির ঠিক কি আছে জলিল সাহেব ভেবে পেলেন না। তার মনে হল মেয়েরা এখন আর আগের মতাে নেই। মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তারাই সবার আগে

হেসে ওঠে। যেমন তার অফিসের ডেসপাস সেকশনের মেয়েটি। কি মায়াকাড়া চেহারা, কি মিষ্টি হাসি। একদিন লাঞ্চের সময় এসে জিজ্ঞেস করল, কি লাঞ্চ আনলেন আজ?

তিনি বললেন, রুটি আর আলু ভাজা।

কয়েকদিন পর আবার জিজ্ঞেস করল । সেদিনও তিনি বললেন রুটি আর আলু ভাজা। তারপর একদিন তিনি শুনেন ডেসপাস সেকশনের সবাই তাকে ডাকছে – মিস্টার পটেটু ভাজা।

এইসব তাকে বিচলিত করে না। কিন্তু এমন একটা মিষ্টি চেহারার মেয়ে যে এতাে সুন্দর করে হাসে সে কি করে মানুষের কষ্ট নিয়ে তামাশা করে? তাছাড়া তিনি তার বাবার বয়সী। বিয়ে করলে এত বড় একটা মেয়ে তার নিশ্চয়ই থাকতাে।

জলিল সাহেবের গুলিস্তানে নামার কথা কিন্তু তিনি প্রেসক্লাবে নেমে পড়লেন। জুতাটা। সারানো যায় কিনা দেখতে হবে। আজ অফিসে দেরি হবেই। গত এক বছরে তিনি একদিন। মাত্র দেরি করেছেন। আজকেরটা নিয়ে হবে দু’দিন। দু’দিন দেরি হলে কিছু হবে না।

কিন্তু সেকশন অফিসার নজমুল হুদা সাহেব তাকে সহ্যই করতে পারেন না। তিনি আসার পর থেকে শুধু খুঁত ধরার চেষ্টা করছেন। একি জলিল সাহেব, চিঠি লিখেছেন ডেট কোথায় ? ডেট ছাড়া চিঠি হয়? বাইশ বছরে কাজ এই শিখেছেন? রিপিটিশনের বুঝি এই। বানান? ডিকশনারি দেখতে পারেন না? অফিসের খরচে তাে ডিকশনারি কেনা হয়। সেটা কি শুধু টেবিলে সাজিয়ে রাখবার জন্যে?

‘ভাউচারগুলাে সই করিয়ে রাখতে বলেছিলাম। এখন দেখি দুটা ভাউচারে কোনাে সই নেই। পেয়েছেন কি আপনি? বাইশ বছরেও সামান্য কাজটা শিখতে না পারলে কখন পারবেন?”

‘আসলে আপনার এখন অফিসের কাজে মন নেই। মন থাকলে এ রকম হয় না।

মুচি ছেলেটি গম্ভীর মুখে টায়ারের রাবার কাটছে। বয়স তের-চৌদ্দর বেশি হবে না কিন্তু কাজের ফাকে ফাকে ফসফস করে সিগারেট টানছে। এক পােচ রাবার কাটে আর গম্ভীর হয়ে। সিগারেটে টান দেয়। ভাবখানা যেন রাবার কাটার মতাে জটিল কাজ এ-পৃথিবীতে আর তৈরী হয়নি। বহু কষ্টে ছেলেটির গায়ে চড় মারার ইচ্ছা দমন করে জলিল সাহেব টুল কাঠের বাক্সের ওপর বসে বসে ঝিমুতে লাগলেন। এগারােটা সাত মিনিটে জুতা তৈরী হল। জলিল সাহেব। সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ছেলেটি ডেকে তুলল তাকে। | না। বয়স হয়ে যাচ্ছে। নয়তাে এ রকম অসময়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়ে? নজমুল হুদা সাহেব ঠিকই বলেছিলেন, বয়স হয়ে গেছে এখন অফিস ছেড়ে বাড়িতে বিশ্রাম করেন। অফিসের কাজ আর আপনাকে দিয়ে হবে না।।

ঠিক সাড়ে এগারােটার সময় তিনি অফিসে পৌছলেন। তার মনে হল । হয়েছে। ডেসপাস সেকশনের আমিন সাহেব কেমন যেন অদ্ভুত চোখে তাকালেন।

জুতাটা ছিড়ে গিয়েছিল। ঠিক করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। আমিন সাহেব কোন কথা বললেন না। রাবারের সেল লাগিয়েছি। দশ টাকা লাগল।

আমিন সাহেব শুধু বললেন, ও তাই বুঝি ?

ডেসপাসের ঐ মেয়েটি হেড ক্লাকের সঙ্গে হাত নেড়ে কি যেন বলছিল। জলিল সাহেবকে দেখেই থেমে গেল। এর মানে কি? জলিল সাহেব কোফতের স্বরে বললেন

জুতার শুকতলিটা খুলে পড়ে গিয়েছিল। মেয়েটি শীতল স্বরে বলল, বড় সাহেব আপনাকে খুজেছিলেন। কখন ? সাড়ে দশটার দিকে। কি জন্যে ? তার কাছ থেকেই শুনবেন।

জলিল সাহেব নিঃশব্দে তার টেবিলে গিয়ে বসলেন। টেবিলের উপর ক্লিয়ারেন্সের দুটি ফাইল ছিল। তার একটিও নেই। তিনি চেয়ারে বসে ঘামতে লাগলেন। পাশের টেবিলের সুভাস বাবু মৃদু স্বরে বললেন, কোনােদিন দেরি করেন না। আজকের দিনটাই দেরি করলেন?

জলিল সাহেব বিড়বিড় করে কি বললেন ঠিক বােঝা গেল না।

আপনার ফাইল দুটো নাজমুল হুদা সাহেব নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন আমাকে দেখে দিতে বলেছেন।

জলিল সাহেৰ কিছু বললেন না। আপনাকে বড় সাহেব দেখা করতে বলেছেন, যান দেখা করে আসুন।

জলিল সাহেব নড়লেন না। ফ্যানের ঠিক নিচেই তার চেয়ার। তবু তিনি কুলকুল করে ঘামতে লাগলেন। তার মনে হল নিশ্চয়ই চাকরি চলে গেছে।

আজ সন্ধ্যায় বাড়ি গিয়ে কি বলবেন তিনি? যার বাড়িতে তিনি মাসে তিনশ’ পনেরাে টাকা দিয়ে থাকেন এবং খান সে তার দূর সম্পর্কের ভাই। তব সে তাকে নিশ্চয় দশ দিনের মধ্যে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। দশ দিন পর নতুন মাস শুরু হচ্ছে। নতুন মাস থেকে অন্য একজন কাউকে সে নেৰে। না নিলে তার সংসার চলবে না। তার বোটি অবশ্যি খুব কষ্ট পাৰে। এই মেয়েটি অন্য মেয়েগুলাের মতাে না। এই মেয়েটির মধ্যে দয়ামায়া আছে। বড় ভালাে মেয়ে।

জলিল সাহেব।

বসে আছেন কেন? যান সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসুন। যাই।।

জলিল সাহেব উঠলেন না, বসেই রইলেন। তার দারুণ তৃষ্ণা বােধ হল। একটি বেয়ারা আছে। তাকে বললেই সে পানি এনে দেয়। কিন্তু তাকেও তিনি কিছু বললেন না। প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে ক্যানের নিচে বসে তিনি ঘামতে লাগলেন।

প্রাইভেট কোম্পানীর চাকরি চলে গেলে টাকা পয়সা তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। প্রভিডেন্ট ফান্ডে অল্প যা কিছু ছিল তার প্রায় সবটা নিয়েই বাবার শেষ চিকিৎসা করাতে হল। জানতেন টাকাটা জলে যাচ্ছে তবু দায়িত্ব পালন। বিনা চিকিৎসায় মরতে দেয়া যায় না।

ক্যান্সার, বাচার কোনাে আশা নেই জেনেও তিন হাজার টাকা খরচ করে অপারেশন। করালেন।

ডাক্তার সাহেব নিজেও নিষেধ করেছিলেন, এই বয়সে অপারেশনের শক সহ্য হবে না।। বাড়িতে নিয়ে যান, শান্তিতে মরতে দিন। অপারেশন সাকসেসফুল হলেও লাভ নেই তেমন। কিছু। বড়জোর বছর খানেক বাচবেন। | কিন্তু বাবা ক্ষেপে উঠলেন অপারেশনের জন্যে। রােজ দু’বেলা জিজ্ঞেস করেন, অপারেশন কবে? তাড়াতাড়ি করা দরকার। এইসব জিনিস যতাে তাড়াতাড়ি হয় ততাে ভাল।

প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে মােট পাঁচ হাজার আটশ’ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। আসলে ছ’হাজার। দু’শ টাকা পান খাওয়ার জন্যে দিতে হয়েছে। তার মধ্যে খরচ হল তিন হাজার। বাকি টাকাটা ফেরত দিয়ে ফেলবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু ফেরত দিতে ইচ্ছা করছিল না। এতগুলাে টাকা হাতছাড়া করতে মায়া লাগে। সব চকচকে নােট। হাতে নিয়ে বসে থাকতেও আনন্দ। নতুন জুতা কিনে ফেললেন একজোড়া, একটা মশারি কিনলেন। আগের মশারিটি দিয়ে তিনটি নারকেল পাওয়া গেল। সদরঘাটের পুরানাে কাপড়ের দোকান থেকে ছাপ্পান্ন টাকায় কোট কিনলেন একটা। এই কোটটিই তার কাল হয়েছিল। কোটের পকেট থেকেই। বাকি টাকাগুলাে পকেটমার হয়। সব নতুন নােট । তিনি সেদিন অফিসে না গিয়ে রেসকোর্সের মাঠে একটা গাছের নিচে সারা দুপুর বসে ছিলেন। রেসকোর্সের মাঠটাকে গাছ-টাছ লাগিয়ে যে এতাে চমৎকার করা হয়েছে তা তিনি জানতেন না।।

লাঞ্চ আওয়ারে বড় সাহেব ডেকে পাঠালেন।।

বড় সাহেবের ঘরে এয়ারকুলার আছে। সেটি বােধহয় কাজ করছে না। জলিল সাহেবের গরম লাগছে। প্রচণ্ড গরম। বড় সাহেবের পাশে নাজমুল হুদা সাহেব বসে আছেন। চেক চেক শার্টের জন্যে তার বয়স খুব কম লাগছে। কিন্তু শার্টের ছাপাটা ভাল না। কেমন যেন চোখে লাগে। জলিল সাহেবের চোখ কড় কড় করতে লাগল।

জলিল সাহেব। জী স্যার।। বসুন। দাড়িয়ে আছেন কেন? জলিল সাহেব বসলেন।। সকাল বেলার দিকে একবার আপনার খোজ করেছিলাম।

জলিল সাহেব জুতা ছেড়ার ব্যাপারটা বলতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু বলতে পারলেন না। গলায় কথা আটকে গেল। বড় সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, হেড অফিস থেকে চিঠি এসেছে। তারা আপনাকে অফিসার্স গ্রেডে প্রমােট করেছে। আপনার সার্ভিসে হেড অফিস খুব স্যাটিসফায়েড।

জলিল সাহব শুকনাে চোখে তাকিয়ে রইলেন। ” নাজমুল হুদা সাহেবের পাশের কামরাটাতে আপনি আপাতত কাজ শুরু করুন। জিনিসপত্র কিছু লাগলে রিকুইজিশন স্লিপ দিয়ে স্টোর থেকে নিয়ে নেবেন।

বড় সাহেব হাত বাড়িয়ে বললেন – কনগ্রাচুলেশনস। হাতটি যে হ্যান্ডসেকের জন্যে।

বাড়ানাে জলিল সাহেব অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুঝতে পারলেন না। যখন পারলেন তখন তার চোখ। দিয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি ধরা গলায় বললেন, স্যার জুতাটা ঠিকমতাে সেলাই করেনি। একটা পেরেক উচা হয়ে আছে। খুব ব্যথা লাগছে। | ক্যানটিনে সবাই বােধহয় তার জন্যে অপেক্ষা করছিল। তাকে আসতে দেখে সবাই উঠে দাড়াল। ডেসপাস সেকশনের মেয়েটি হাসি মুখে বলল, স্যার আপনার সম্মানে আজ আমরা সবাই দুপুরে একটু বিশেষ খাওয়া-দাওয়া করবাে। নজমুল হুদা সাহেবও খাবেন আমাদের সঙ্গে। | কিছু একটা বলা দরকার। সবাই হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। জলিল সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, জুতাটা ঠিকমতাে সেলাই করেনি। একটা পেরেক উচা হয়ে আছে।

কাদের মিয়া বিরিয়ানী এবং একটি করে টিকিয়া আনতে স্টেডিয়ামে গেছে। জলিল সাহেব তার নিজের লাঞ্চ বাক্সটি হাতে করে চুপচাপ বসে রইলেন। তার খুব ইচ্ছা করছিল ডেসপাস সেকসনের মেয়েটিকে লাঞ্চ বাক্সটি খুলে দেখান। কারণ সেখানে রুটি এবং আলুভাজা ছাড়াও একটা খেজুরগুড়ের সন্দেশ আছে। রােজ-রােজ এক জিনিস খেতে কষ্ট। হয় ভেবেই বাড়ি থেকে মেয়েটি দিয়ে দিয়েছে। তিনি খুব আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু মেয়েটি শােনেনি। মেয়েজাতটা হচ্ছে মায়াবতীর জাত। শুধু শুধু মায়া দেখায়। জলিল সাহেবের চোখ আবার ভিজে উঠলাে। ডেসপাস সেকশনের মেয়েটি বলল, স্যার আপনার কষ্ট হচ্ছে। আপনি বরং জুতাটা খুলে রাখুন।

 

গল্পটি কালজয়ী লেখক “হুমায়ুন আহমেদ স্যার “ এর

পরবর্তী গল্পের জন্য ক্লিক করুন এখানে “অসময়

প্রতি সপ্তাহের চাকরির খবর পেতে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here