একটি নীল বোতাম

বারান্দায় এশার বাবা বসেছিলেন। | হাঁটু পর্যন্ত তােলা লুঙ্গি, গায়ে নীল রঙের গেঞ্জী। এই জিনিস কোথায় পাওয়া যায় কে জানে? কি সুন্দর মানিয়েছে তাকে। ভদ্রলােকের গায়ের রঙ ধবধবে শাদা। আকাশী রঙের গেঞ্জীতে তার গায়ের রঙ ফুটে বেরুচ্ছে। সব মিলিয়ে সুখী-সুখী একটা ছবি। নীল রঙটাই বােধহয় সুখের। কিংবা কে জানে ভদ্রলােকের চেহারাটাই বােধহয় সুখী-সুখী। কালাে রঙের গেঞ্জীতেও তাকে হয়ত সুখী দেখাবে।

তিনি আমাকে দেখতে পাননি। আমি ইচ্ছা করেই গেটে একটু শব্দ করলাম। তিনি আমাকে দেখলেন। সুন্দর করে হাসলেন। ভরাট গলায় বললেন, আরে রঞ্জ তুমি ? কি খবর ? ভাল আছ?

জি অঙ্কেল । গরম কি রকম পড়ছে বল দেখি?

খুব গরম। আমার তাে ইচ্ছা করছে চৌবাচ্চায় গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকি।।

তিনি তার পাশের চেয়ারে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। হাসি-হাসি মুখে বললেন, বসাে। তােমার কাছ থেকে দেশের খবরা-খবর কিছু শুনি।

আমার কাছে কোন খবরা-খবর নেই চাচা।।

না থাকলে বানিয়ে বানিয়ে বল। বর্তমানে চালু গুজব কি ?

আমি বসলাম তার পাশে। এশার বাবার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভাল লাগে। মাঝে মাঝে এ বাড়িতে এসে শুনি এশা নেই – মামার বাড়ি গেছে। রাতে ফিরবে না। তার মামার বাড়ি ধানমণ্ডিতে। প্রায়ই সে সেখানে যায়। আমার খানিকটা মন খারাপ হয়। কিন্তু এশার। বাবার সঙ্গে কথা বললে আমার মন খারাপ ভাবটা কেটে যায়।

এই যে এখন বসলাম উনার পাশে – এখন যদি শুনি এশা বাসায় নেই, মামার বাড়ি গিয়েছে – আমার খুব খারাপ লাগবে না।

তারপর রঞ্জ নতুন কোন গুজবের কথা তাহলে জান না ? জি না ।। বল কি তুমি? শহর ভর্তি গুজব। আমি তাে ঘরে বসে কত কি শুনি। চা খাবে? জি না ।।

খাও এক কাপ। তােমার সঙ্গে আমিও খাব। তুমি আরাম করে বস। আমি চায়ের কথা বলে আসি।

আপনাকে বলতে হবে না, আমি বলে আসছি। এশা কি বাসায় নেই?

আছে। বাসাতেই আছে।

বলেই তিনি চায়ের কথা বলতে উঠে গেলেন। কি চমৎকার তাঁর এই ভদ্রতা। আমি কে ? কেউ না। অতি সামান্য একজন। একটা এ্যাড ফার্মে কাজ করি। অল্প যে ক’টা টাকা পাই তার প্রতিটির হিসাব আমার আছে। আর এঁরা? আমার ধারণা, এদের যে থাকা দারােয়ান আমার চেয়ে বেশি টাকা পায়। নিতান্ত ভাগ্যক্রমে এদের এক আত্নীয়ের সাথে এ-বাড়িতে এসেছিলাম। প্রথম দিনেই এশার কি সহজ সুন্দর ব্যবহার যেন সে অনেকদিন। থেকেই আমাকে চেনে। সেদিন কেমন হাসিমুখে বলল, আপনি তাে বেশ লম্বা। আসুন একটা কাজ করে দিন। চেয়ারে দাঁড়ান, দাঁড়িয়ে খুব দ্রুতে একটা পেরেক লাগিয়ে দিন।

আমি বললাম, এত উঁচুতে পেরেক দিয়ে কি করবেন ? আজ বলব না। আরেকদিন এসে দেখে যাবেন।

দ্বিতীয়বার এ বাড়িতে আসার কি চমৎকার অজুহাত তৈরী হল। অথচ অজুহাতের কোন প্রয়োজন ছিল না। এদের বাড়ি- দুয়ারখােলা বাড়ি। যে কেউ যে কোন সময় আসতে পারে। কোন বাধা নেই। অথচ মনে আছে দ্বিতীয়বার কত ভয়ে ভয়ে এসেছি। গেট খুলে ভেতরে ঢােকার সাহস হয়নি। যদি আমাকে কেউ চিনতে না পারে। যদি এশা বিস্মিত হয়ে বলে, আপনি কাকে চান ?

সে রকম কিছুই হল না। এশার বাবা আমাকে দেখে হাসি মুখে বললেন, কি ব্যাপার রঞ্জ, গেটের পাশে দাড়িয়ে আছ কেন? আস, ভেতরে আস।।

আমি খানিকটা বিব্রত ভঙ্গিতেই ঢুকলাম। তিনি হাসিমুখে বললেন, দেশের খবরা-খবর বল। নতুন কি গুজব শুনলে?

এশা বােধহয় বাইরে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, বেছে বেছে আজকের দিনটিতেই আপনি এলেন? এখন বেরুচ্ছি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। চট করে আসুন তাে, পেরেকটা কি কাজে লাগছে দেখে যান। | আমি ইতস্ততঃ করছি। এশার বাবার সামনে থেকে উঠে যাব, উনি কি মনে করেন কে জানে। উনি কিছুই মনে করলেন না। সুখী-সুখী গলায় বললেন, যাও দেখে আস। জিনিসটা ইন্টারেস্টিং |

পেরেক থেকে হলুদ দড়ির মত একটা জিনিস মেঝে পর্যন্ত নেমে এসেছে। এশা বাতি নিভিয়ে একটা সুইচ টিপতেই অদ্ভুত ব্যাপার হল। হলুদ দড়ি আলােয় ঝিকমিক করতে লাগল। সেই আলাে স্থির নয়। যেন গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে নামছে। আলাের ঝরণা।

অপূর্ব! কি, অবাক হয়েছেন তাে ? হা হয়েছি। এ রকম অদ্ভুত জিনিস এর আগে কখনাে দেখছেন? জি না।।

আমার বড় বােন পাঠিয়েছেন। নেদারল্যাণ্ড থাকেন যিনি, তিনি। এখন যান। বসে বসে বাবার গল্প শুনুন। বাবা কি আপনাকে তার কচ্ছপের গল্পটা বলেছে ?

জি না। তাহলে হয়ত আজ বলবে। বাবার গল্প বলার একটা প্যাটার্ণ আছে। কোনটির পর কোন গল্প আসবে আমি সব জানি।।

এশা হাসল। কি সুন্দর হাসি। আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম – না জানি কোন ভাগ্যবান পুরুষ এই মেয়েটিকে সারা জীবন তার পাশে পাবে।

এশার বাবা সেদিন কচ্ছপের গল্প বললেন না। পরের বার যেদিন গেলাম সেদিন বললেন।

কচ্ছপ কোথায় ডিম পাড়ে জানো তাে রঞ্জ ? ডাঙ্গায়। সে নিজে থাকে কিন্তু পানিতে। চলাফেরা, জীবনযাত্রা সবই পানিতে অথচ তার মন পড়ে থাকে তার ডিমের কাছে ডাঙ্গায়। ঠিক না? ঠিক।

বুড়াে বয়সে মানুষেরও এই অবস্থা হয়। সে বাস করে পৃথিবীতে কিন্তু তার মন পড়ে থাকে পরকালে। আমার হয়েছে এই দশা।

এই পরিবারটির সঙ্গে পরিচয় হবার পর আমার মধ্যে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন হল। আগে বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে চমৎকার লাগতাে। এখন আর লাগে না। এক সময় মেয়েদের নিয়ে কেউ কোন কুৎসিত কথা বললে বেশ মজা পেতাম। এখন ভয়ংকর রাগ লাগে। মনে হয় এই কুৎসিত কথাটি কোন না কোন ভাবে এশাকে স্পর্শ করছে। যে খুপড়ি ঘরটায় থাকি সেই ঘর আমার আর এখন ভাল লাগে-না। দম বন্ধ হয়ে আসে। নােনাধরা বিশ্রী দেয়াল। একটি ছােট জানালা যা দিয়ে আলাে-বাতাস আসে না

রাতের বেলা শুধু মশা ঢুকে। চৈত্র মাসের গরমে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকি। নানান রকম কল্পনা মাথায় আসে। কল্পনায় আমার এই ঘর হয়ে যায় পদ্মানদীর নৌকায় একটা ঘর। জানালা খুললেই নদী দেখা যায়। সেই নদীতে জোছনা হয়েছে। চাঁদের আলাে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। ঘরের দরজায় টোকা পড়ে। আমি জানি কে টোকা দিচ্ছে। তবু কাঁপা গলায় বলি, কে? এশা বলে, কে আবার? আমি। এরকম চমৎকার রাতে আপনি ঘরটর বন্ধ করে বসে আছেন। পাগল নাকি? আসুন তাে।

কোথায় যাব? কোথায় আবার, নৌকার ছাদে বসে থাকব।

আমরা নৌকার ছাদে গিয়ে বসি। মাঝি নােকা ছেড়ে দেয়। এশা গুনগুন করে গায়, যদি আমায় পড়ে তাহার মনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে। আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।

সবই খুব সুন্দর সুখের কল্পনা। তবু এক এক রাতে কষ্টে চোখে জল আসে। সারারাত জেগে বেসে থাকি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাবি, আমার এই জীবনটা আমি কি কিছুতেই বদলাতে পারি না? | বন্ধু-বান্ধব সবাইকে অবাক করে এক সন্ধ্যায় জগন্নাথ কলেজের নাইট সেকশানের এম.এ ক্লাসে ভর্তি হয়ে যাই। ধার-টার করে আমার ঘরের জন্যে নতুন পর্দা, বিছানার নতুন চাদর, নেটের মশারী কিনে ফেলি। অনেক ঘােরাঘুরি করে একটা ফুলদানী কিনি। একশ’ টাকা লেগে যায় ফুলদানীতে। তা লাগুক, তবু তাে একটা সুন্দর জিনিস। একগুচ্ছ রজীনগন্ধা যখন এখানে রাখব তখন হয়ত এই ঘরের চেহারা পাল্টে যাবে। আমার এক আটিস্ট বন্ধুর কাছ থেকে একদিন প্রায় জোর করে জলরঙ্গা একটা ছবিও নিয়ে আসি। নােনাধরা দেয়ালে সে ছবি মানায় না। নিজেই চুন এনে দেয়ালে চুনকাম করি। চুন দেয়ালে আটকায় না, ঝরে ঝরে পড়ে। তবু আমার ঘর দেখে বন্ধুরা চোখ কপালে, করছিস কি তুই? ইন্দ্রপুরী বানিয়ে ফেলেছিস দেখি। আবার দেখি খুশবুও আসছেন বিছানায় আতর ঢেলে দিয়েছিস নাকি?

মাই গড। মেয়ে মানুষ ছাড়া এই ঘর মানায় না। এক কাজ কর একশ টাকা দিয়ে এক মেয়ে মানুষ এক রাতের জন্যে নিয়ে আয়। ফুর্তি কর। আমরা পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখি।

রাগে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। কিছু বলি না। কি হবে বলে। আমার বন্ধুরা ভোর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেয়। সিগারেটের টুকরা দিয়ে মেঝে প্রায় ঢেকে ফেলে। একজন আমার নতুন কেনা বিছনায় চায়ের কাপ উল্টে দিয়ে বলে, যা শালা, চাদে কলংক লেগে গেল।

আমি কিছু বলি না। দাঁতে দাঁত চেপে থাকি। আর মনে মনে ভাবি – এই মূর্খদের সঙ্গে কি করে এতদিন কাটিয়েছি। কি করে এদের সহ্য করেছি?

ইরফান বলল, প্রেম ফ্রেম করেছিস কিনা বল। তাের হাবভাব যেন কেমন রঙ্গিলা। আমি জবাব দেই না। ইরফান পান-খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, জিনিস কেমন বল। টিপেটুপে দেখেছিস তাে?

সবাই হাে হাে করে হাসে। কোন অন্ধকার নরকে এরা পড়ে আছে? এদের কি কোনদিন মুক্তি ঘটবে না? আমার ইচ্ছা করে এশাকে একদিন ওদের সামনে উপস্থিত করি। সেটা নিশ্চয়ই খুব অসম্ভব নয়। বললেই সে আসবে। তবে আমার বলতে সাহস করে না।

প্রথম যেদিন তাকে তুমি বললাম কি প্রচণ্ড ভয়ে ভয়েই না বললাম। সে গােলাপ গাছের ডাল ছেটে দিচ্ছিল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ কি হল নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম, কাচিটা আমার হাতে দাও, আমি ছেটে দি। বলেই মনে হল – এ কি করলাম আমি? আমার মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। আমার মনে হল সে এবার চোখে চোখে তাকিয়ে শীতল গলায় বলবে, আমাকে তুমি করে বলবেন না। এত ঘনিষ্ঠতা তাে আপনার সঙ্গে আমার নেই।।

এশা সে রকম কিছুই বলল না। কাচি আমার হাতে দিয়ে বলল, তিন ইঞ্চি করে। কাটবেন। এর বেশী না। আর আপনি কি চা খাবেন ? ।

হ্যা খাব। ” চা নিয়ে আসছি। শুনুন, এ রকম কচকচ করে কাটবেন না, ওরা ব্যথা পায়। গাছেরও জীবন আছে। জগদীশ চন্দ্র বসুর কথা।।

এশা ঘরে ঢুকে গেল। চৈত্র মাসের বিকেলে আমি গােলাপ ছাটতে লাগলাম। আমার ত্রিশ বছর জীবনের সেটা ছিল শ্রেষ্ঠতম দিন। বিকালটাই যেন কেমন অন্যরকম হয়ে গেল। শেষ বিকেলের রােদকে মনে হল লক্ষ লক্ষ গােলাপ, বাতাস কি মধুর। এশার বাবা যখন বাইরে এসে বললেন, তারপর রঞ্জ দেশের খবর কি বল ? নতুন কি গুজব শুনলে ?

কি যে ভাল লাগল সেই কথাগুলি! মনে হল এরকম সুন্দর কথা এর আগে আমাকে। কেউ বলে নি।

গোলাপের ডলি ছাটছো মনে হচ্ছে। জি চাচা ।

এর একটা ফিলসফিক আসপেকট আছে। সেটা লক্ষ্য করেছ ? ফুল ফোটাবার জন্যে। গাছকে কষ্ট দিতে হচ্ছে। হা হা হা।

তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমিও হাসলাম। এশা চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলল, এত হাসাহাসি হচ্ছে কেন? আমি কি যােগ দিতে পারি?

ওদের বাড়ি থেকে ফিরলাম সন্ধ্যার পর | এশা গেট পর্যন্ত এল। হাসিমুখে বলল, আবার আসবেন। | এই কথাটি কি পৃথিবীর মধুরতম কথার একটি নয়? আমি আবার আসতে পারি এ বাড়িতে। যতবার ইচ্ছা আসতে পারি। আমাকে কোন অজুহাত তৈরী করতে হবে না। তবুও ছােটখাট কিছু অজুহাত আমি তৈরী করেই রাখি। যেমন একবার আমার একটা হ্যাণ্ড ব্যাগ ফেলে এলাম যাতে পরদিন গিয়ে বলতে পারি, জরুরী কিছু কাগজপত্র ছিল। যাক পাওয়া গেল। সবচে বেশী যা করি তা হচ্ছে – গল্পের বই নিয়ে আসি। তারপর সেই বই ফেরত দিতে যাই।  গল্পের বই আমি পড়ি না। ভাল লাগে না। কোন কালেও ভাল লাগেনি। তবু রাতে শুয়ে শুয়ে বইয়ের ঘ্রাণ নেই, পাতা ওল্টাই। এশার স্পর্শ এই বই গুলির পাতায় পাতায় লেগে আছে ভাবইে আমার রােমাঞ্চ বােধহয়। গা শিরশির করে। গভীর আনন্দে চোখ ভিজে উঠে। বই ওল্টাতে ওটাতে একরাতে অদ্ভুত এক কাণ্ড হল। টুক করে বইয়ের ভেতর থেকে কি যেন পড়ল। তাকিয়ে দেখি ছোট একটা নীল রঙের বোতাম। যেন একটা নীল অপরাজিতা। নাকের কাছে নিয়ে দেখি সত্যি গন্ধ আসছে। আমি গভীর মমতায় বােতামটা বালিশের নীচে রেখে দিলাম। সারারাত ঘুম হল না। কেবলি মনে হল একদিন না একদিন এশা আসবে এ বাড়িতে। আমি তাকে বলব তুমি যে ফুলটি আমাকে দিয়েছিলে সেটা এখনাে ভাল আছে। কি সুন্দর গন্ধ। সে অবাক হয়ে বলবে, আমি অবার ফুল দিলাম কবে? এর মধ্যে ভূলে গেলে ? একটা নীল ফুল দিয়েছিলে না ? বলেন কি ! নীল ফুল আমি কোথায় পাব?

আমি বালিশ সরিয়ে বােতামটা বের করে আনবো। এশা বিস্মিত হয়ে বলবে – এটা বুঝি আপনার নীল ফুল ? আমি বলব, বিশ্বাস না হলে গন্ধ শুকে দেখাে।

এশার বাবা নিজেই দুকাপ চা নিয়ে ঢুকলেন। আমার বড় লজ্জা লাগল। আমি বললাম, ছিঃ ছিঃ, আপনি কেন? তিনি হেসে বললেন, তাতে কি হয়েছে? খাও, চা খাও। চিনি হয়েছে কি-না বল ।

হয়েছে। গুড। চিনি আমি নিজেই দিয়ে এনেছি। কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই ব্যস্ত। কোন উৎসব নাকি?

উৎসৰ কিছু না। মেয়েলী ব্যাপার। এশার বিয়ে ঠিক হল। ওরা দিন পাকা করতে আসৰে। রাত আটটায় আসবে। এখনাে তিন ঘণ্টা দেরী অথচ ভাব দেখে মনে হচ্ছে …।

আমি নিঃশব্দে চায়ে চুমুক দিতে লাগলাম। এশার বাবা বললেন, ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ সাহেবের ছেলে। তুমি চিনবে নিশ্চয়ই। ইমতিয়াজ চৌধুরী, জিয়ার আমলে হেলথ মিনিস্টার ছিলেন। ছেলেটা খুব ভাল পেয়েছি। জার্মানী থেকে পিএইচ.ডি করেছে ক্যামিকেল ইনজিনীয়ারিং-এ। এখন দেশে কি সব ইণ্ডাস্ট্রি দিবে। রঙ তৈরী করবে। আমি ঠিক বুঝিও না।

চা শেষ করবার পরও আমি খানিকক্ষণ বসে রইলাম। যাবার আগে এশী বেরিয়ে এল। কি চমৎকার করেই না আজ তাকে সাজিয়েছে। তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হয়। এশা হাসিমুখে বলল, বেছে বেছে আপনি ঝামেলার দিনগুলিতে আসেন কেন বলুন তাে? | আমি ফিরে যাচ্ছি আমার খুপড়ি ঘরে। অন্যসব রাতের মত আজ রাতেও হয়ত ঘুম হবে না। বালিশের নীচ থেকে নীল বােতাম বের করে আজো নিশ্চয়ই দেখব। এই পরিবারটির কাছ থেকে একটা নীল বােতামের বেশী পাওয়ার যােগ্যতা আমার ছিল না। এই সহজ সত্যটি আজ রাতেও আমার মাথায় ঢুকবে না। আজ রাতেও বােতামটিকে মনে হবে একটি অপরাজিতা ফুল।

গল্পটি কালজয়ী লেখক “হুমায়ুন আহমেদ স্যার “ এর

পরবর্তী গল্প “ভালবাসার গল্প” এর জন্য আমাদের সঙ্গে থাকুন।

প্রতি সপ্তাহের চাকরির খবর পেতে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here