ঘরে ঢুকেই দেখি বসার ঘরের সােফায় হলুদ চাদর গায়ে দিয়ে কে যেন শুয়ে আছে। লােকটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে রগ—উঠা ময়লা পা বের হয়ে আছে। সােফার হাতলে যে গােলাকার দাগ তা ঐ পা থেকে এসেছে, বলাই বাহুল্য। রাগে আমার কান ঝা ঝা করতে লাগল।

রান্না ঘরে জরী চা বানাচ্ছিল। আমাকে দেখেই হাসিমুখে বলল, চায়ের সঙ্গে কি খাবেন ঘরে কিছুই নেই। লুচি ভেজে দেব?

আমি শুকনাে গলায় বললাম, কে এসেছে ?

আমি জানি না। মগবাজার থেকে এসে দেখি উনি শুয়ে আছেন। করিম দরজা খুলে দিয়েছে। তােমার নাকি কি রকম আত্মীয় হন।

অনেকক্ষণ আমার মুখে কোন কথা এল না। দুদিন পরপর একি যন্ত্রণা ! গত সপ্তাহেই এসেছে দুজন। এর মধ্যে একজনের আবার ফিরে যাওয়ার ভাড়া ছিল না। তাকে নেত্রকোনায় ফিরে যাওয়ার ভাড়া বাবদ ত্রিশ টাকা দিতে হয়েছে। আমার হিসেব করা বেতনে ত্রিশ টাকার দাম আছে। মাসের বিশ তারিখে অফিস থেকে ফিরে নতুন একজন মেহমানকে দেখলে আমার সঙ্গত কারণেই মন খারাপ হয়।

তুমি হাত-মুখ ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে বস। আমি চা নিয়ে আসছি। কতদিন থাকবেন কিছু জানাে নাকি? না। তবে বিছানাপত্র নিয়ে এসেছেন। কাজেই দীর্ঘ পরিকল্পনা থাকা বিচিত্র নয়।

জরী মুখ নিচু করে হাসল। এর মধ্যে হাসির কি আছে কে জানে। জরীকে আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

বিয়ের পর থেকেই সে মেহমানদারী করছে। সবই আমার গ্রামের বাড়ির গরীব আত্মীয়-স্বজন। কেউ চাকবির সন্ধানে, কেউ চিকিৎসার জন্যে। আবার কেউ কেউ নিছক বেড়াবার জন্যে। নতুন এয়ারপােট দেখবে, চিড়িয়াখানায় যাবে, শিশুপার্কে যাবে। জরী নির্বিকার, যেন এইসব ঝামেলা বিচলিত হওয়ার মতাে কোন ঝামেলা নয়।।

আমি প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম জরীর এই ব্যাপারটি লােক দেখানো। আমার কাছে প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে সে যদিও অনেক বড়লােকের বাড়ির মেয়ে তবু আমার গরীব আত্মীয়-স্বজনদের সে মােটেই অবহেলা করে না। এখন বুঝতে পারছি আমার ধারণা ঠিক নয়। কোন এক বিচিত্র কারণে জরীর মধ্যে বিরক্ত হবার ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। আমি যখন দেখি আমার কোন ফুপাতাে ভাই কিংবা খালাতাে ভাই কার্পেটের ওপর নাক ঝেড়ে টেবিল ক্লথে হাত মুছছে তখন আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। অথচ জরীকে দেখি বেশ সহজ এবং স্বাভাবিক যেন কাপেটে নাক ঝাড়া তেমন কোনাে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়।

বারান্দায় ফুরফুরে হাওয়া। তবু আমার বিরক্ত ভাব কাটল না। জরী চা নিয়ে আসতেই বললাম, এই রকম মেহমানদারী করলে তাে চলবে না জরী।।

যতক্ষণ চলছে চলুক। তুমি চা খেয়ে ভদ্রলােককে ডেকে তুলে আলাপ-পরিচয় কর। রাগ করার কি আছে বল ?

রাগ করার কিছু নেই? উহু।।

সময়-অসময় নেই স্পঞ্জের স্যাণ্ডেল পরে মাথায় একটা কাঠাল নিয়ে লােকজন আসতে থাকবে আর আমি গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরবাে ?

জরী খিলখিল করে হেসে উঠল। যেন এরকম মজার কথা সে বহুদিন শুনেনি। চা। খেতে-খেতেই জানা গেল মেহমানের ঘুম ভেঙেছে এবং মেহমান আমার খোজ করেছেন। আমি গিয়ে দেখি হাসু চাচা! প্রায় এগারাে বছর পরে দেখা । ডান গালে লাল জজুল না দেখলে চিনতেই পারতাম না। কি চেহারা হয়েছে ! মাথার চুল উঠে গেছে, সরু-সরু হাত-পা।। আমাকে দেখেই বললেন, বিয়ে করলি, খবর তাে দিস নাই।

আপনিও তাে আমাকে কোনদিন কোন খবর দেননি চাচা? তা ঠিক। খুব ঠিক কথা।। আপনার শরীরের একি অবস্থা হয়েছে ?

মরণ রােগ। মরবার সময় যেসব অসুখ-বিসুখ হয় সেইসব। ভাবলাম মরবার আগে একবার দেখে যাই। বৌমাকেও দেখি। বৌমার খুব প্রশংসা শুনি লােকের কাছে।

আমি জরীকে গিয়ে বললাম, ইনি আমাদের হাসু চাচা। তুমি যার বাড়িতে থেকে মেট্রিক পাস করেছিলে?

এই প্রথমবার দেখলাম মেহমান দেখে বিরক্ত হওনি। হাসু চাচা না থাকলে আমার পড়াশােনা হত না জরী।

জরী হাসতে হাসতে বলল, পড়াশােনা না হলে আমার সঙ্গে তােমার দেখা হতো না। কাজেই আমাদের দুজনের দেখা হওয়ার পেছনেও তােমার হাসু চাচা।।

রাতে হাসু চাচার অবস্থা খারাপ হল। আকাশ-পাতাল জর। আমাদের পাড়ার আফজল ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলাম রাত এগারােটায়। ডাক্তার বললেন, এতাে সিরিয়াস রােগী হাসপাতালে দিতে হবে। হাসু চাচা শ্বাস টানতে টানতে বহু কষ্টে বললেন, হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়ােজন নাই। প্রয়ােজন নেই বললে তাে হবে না। জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

জরী আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, ইনার আত্মীয়-স্বজনদের খবর দেওয়া প্রয়ােজন মনে হয়। কেমন করে তাকাচ্ছেন দেখাে না। তুমি আমার ফুপার কাছেও একবার যাও। ফুপাকে নিয়ে এসাে সঙ্গে করে।

ফুপা অবশ্যি এলেন না। জরীর আত্মীয়-স্বজনরা কেউ কখনাে আসেন না আমার এখানে। তবে তিনি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। রাগী রাগী গলায় বললেন, শুধু শুধু বাড়িতে ঝামেলা করবেন না। হাসপাতালে দিন। আমি বলে দেবাে ভালাে খোজখবর করবে।

বাসায় ফিরে দেখি হাসু চাচার অবস্থা আরাে খারাপ হয়েছে। আমাকে চিনতে পারেন না, কথা বললে জবাব দেন না, মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে তাকান।

জরী একবার পানির গ্লাস নিয়ে ঢুকতেই অবাক হয়ে ডাকতে লাগলেন, ও মিনু ও মিনু।

জরী ফ্যাকাশে হয়ে বললাে, মিনু কে? আমি বললাম, হাসু চাচার মেয়ে। অনেকদিন আগে মারা গেছে। হাসু চাচা টেনে টেনে বললেন, ও মিনু ও মিনু, বেটি কাছে আয়। আয় না।

রাত একটার সময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দুটা বেজে গেল। জরী দেখি একা একা জেগে বসে আছে। তার মুখ রক্তশূন্য। একদিনের পরিশ্রমে চোখের নিচে কালি পড়েছে।

অবস্থা কি তার? বেশি ভালাে না। স্যালাইন দিচ্ছে। তুমি কি চা খাবে এক কাপ?

এতাে রাতে ইচ্ছা করছে না।। খাও না। আমার খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। হাত-মুখ ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে বসাে। আমি নিয়ে আসছি।

আমরা ঘুমাতে গেলাম প্রায় শেষরাতে। বাতি নিভিয়ে বিছানায় উঠতেই জরী মৃদুস্বরে বলল, তােমার হাসু চাচার যে একটি মেয়ে ছিল মিনু – এই কথা কিন্তু তুমি আমাকে কখনাে বলােনি।

এটা এমন কোনাে দরকারী কথা না জরী।

জরী অনেকক্ষণ কোনাে কথা বলল না। তারপর হঠাৎ বলল, মাঝে মাঝে তুমি যখন আমাকে খুব আদর করাে তখন কিন্তু আমাকে ‘মিনু’ ডাকো।

আমি কোনাে জবাব দিলাম না। জরী বলল, হাসু চাচার মেয়েটি কখন মারা গিয়েছিল । ক্লাস নাইনে পড়ার সময়।

মেয়েটি কেমন ছিল দেখতে?

আমি জবাব দিলাম না। দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে জরী আমার হাত ধরল। ভালােবাসার গাঢ় স্পর্শ। বাইরের অস্পষ্ট আলােয় জরীর মুখ অবিকল সেই বালিকা মিনুর মুখের মতাে দেখাতে লাগল। সেই মুখ আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।

গল্পটি কালজয়ী লেখক “হুমায়ুন আহমেদ স্যার “ এর

পরবর্তী গল্পের জন্য ক্লিক করুন এখানে “একটি নীল বোতাম

প্রতি সপ্তাহের চাকরির খবর পেতে আমাদের সাইট ভিজিট করুন।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here